মো. আবুল মনসুর, ময়মনসিংহ
একসময় ট্রেনের হুইসেল আর যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকত ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশন। টিকিট কাউন্টারে ছিল যাত্রীদের ভিড়, প্ল্যাটফর্মজুড়ে থাকত ট্রেনের অপেক্ষা। অথচ এখন সেই স্টেশনে নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। স্টেশন ভবন, প্ল্যাটফর্ম ও রেললাইন সবই আছে, শুধু নেই স্বাভাবিক কার্যক্রম। থামে না যাত্রীবাহী ট্রেন, খোলে না টিকিট কাউন্টার।
দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশনটি এখন যেন শুধু নামেই টিকে আছে। ফলে কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ হারিয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একই সঙ্গে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
স্কুল শিক্ষক আকরাম উদ্দিন বলেন, করোনাকালীন সময় থেকে ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশনের নিয়মিত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ পথে চলাচলকারী স্থানীয় যাত্রীসেবার কয়েকটি ট্রেনও বন্ধ হয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন রুটে রেল যোগাযোগ সচল হলেও ঈশ্বরগঞ্জবাসীর ভাগ্যে ফেরেনি আগের সেই রেলসেবা।
ফলে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ যাত্রীদের বেশি ভাড়া দিয়ে সড়কপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
চাকুরীজীবি মিনহাজ উদ্দিন এর অভিযোগ, আগে ট্রেনে অল্প খরচে ও তুলনামূলক নিরাপদে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া গেলেও এখন সেই সুযোগ না থাকায় সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।
রেলস্টেশন বন্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর। কৃষিপ্রধান ঈশ্বরগঞ্জে উৎপাদিত ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যসহ ব্যবসায়িক মালামাল দূরবর্তী বাজারে পাঠাতে এখন পুরোপুরি সড়ক পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক আক্কাস মিয়া জানান, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের লাভ কমে যাচ্ছে। আবার সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছাতে না পারায় অনেক সময় পচনশীল কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তাদের দাবি, রেলস্টেশনটি চালু হলে কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে স্টেশনের মূল্যবান অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। কোথাও পুরোনো স্থাপনা ভেঙে যাচ্ছে, আবার কোথাও অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন সরঞ্জাম।
স্থানীয় ব্যাবসায়ী বিল্লাহ বাকীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্টেশন এলাকায় নজরদারিও কমে গেছে। ফলে রেলওয়ের বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি ও সম্পত্তি দখলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সমাজ সেবক তারেক’র দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশনের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হোক। একই সঙ্গে নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা হোক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ময়মনসিংহের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, জনবল, অবকাঠামো ও স্টেশনটির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই বন্ধ থাকা রেলস্টেশনের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে আবারও সচল হবে ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশন। ফিরবে ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের কোলাহল এবং স্বল্প খরচে যাতায়াতের সেই পুরোনো সুবিধা।

