নিজস্ব প্রতিবেদক , ময়মনসিংহ
শুষ্ক মৌসুমে কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও জেগে ওঠে বালুর চর। পালতোলা নৌকা কিংবা জাল হাতে জেলেদের কর্মব্যস্ততাও তখন চোখে পড়ে না। সরু খালের মতো রূপ নিয়ে ময়মনসিংহের প্রাণ ব্রহ্মপুত্র নদ পড়ে থাকে প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায়। তবে বর্ষা এলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। পাড়ভাঙা স্রোত, উত্তাল ঢেউ, পালতোলা নৌকা আর জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখে মনে হয়—হারানো যৌবন যেন আবার ফিরে পেয়েছে ব্রহ্মপুত্র।
বর্ষার নতুন পানিতে এখন পরিপূর্ণ ব্রহ্মপুত্র। নদীর তীরে বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। কেউ শীতল বাতাসে প্রশান্তি খুঁজতে আসছেন, কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌভ্রমণে বের হচ্ছেন। আবার নতুন পানিতে ছোট মাছের দেখা পাওয়ায় জাল হাতে নদে ফিরেছেন জেলেরাও।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষার এই সাময়িক রূপের আড়ালে ব্রহ্মপুত্রের দীর্ঘমেয়াদি সংকট এখনো কাটেনি। নদটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রায় ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২৭ কিলোমিটার নদ খনন প্রকল্প নেওয়া হলেও সাত বছরে কয়েক দফা প্রকল্পের মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিকল্পিতভাবে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে খননকাজকে কেন্দ্র করে বালু উত্তোলন ও বাণিজ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নদীপাড়ের মানুষ।
ব্রহ্মপুত্র নদঘেঁষে গড়ে ওঠা জয়নুল পার্কে ঘুরতে আসা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাইজু ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর গত বছরের এপ্রিলে প্রথম ব্রহ্মপুত্র দেখতে এসেছিলাম। তখন নদে পানি ছিল না বললেই চলে। কোথাও হাঁটুসমান পানি, আবার কোথাও মানুষ পায়ে হেঁটে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাতায়াত করছিল। তখন নদটির চেয়ে খালের মতোই মনে হয়েছিল। কিন্তু এবার এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখছি। নদে অনেক পানি, অনেক নৌকা আর মনজুড়ানো শীতল বাতাস। সত্যিই খুব ভালো লাগছে।”
শহরের বাসিন্দা প্রবাল দাস জানান, ছোটবেলায় ব্রহ্মপুত্রে গোসল করা ও বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরার অনেক স্মৃতি রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, “এখন আর সেই অবস্থা নেই। পানিতে বালু থাকে, গোসল তো দূরের কথা, এই পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়ারও উপযোগী নয় অনেক সময়। তবে বর্ষায় নতুন পানি এলে নদটি আবার প্রাণ ফিরে পায়। এখন নদকে দেখে শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে।”
পালতোলা নৌকার মাঝি হান্নান মিয়া বলেন, বছরের প্রায় আট মাস পানি কম থাকায় নৌকা নিয়ে বসে থাকতে হয়। যাত্রীও পাওয়া যায় না। অনেক সময় নৌকা চললেও বালুর চরে আটকে যেত। ফলে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ থাকত। এখন নদে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীও বেড়েছে। ঘণ্টাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় মানুষকে নৌভ্রমণ করানো হচ্ছে। এতে আবার কিছুটা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নদের তীরে মাছ ধরতে থাকা নূরুল ইসলাম জানান, একসময় ব্রহ্মপুত্রে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এবং নদকে কেন্দ্র করে অনেক জেলে পরিবারের জীবিকা চলত। কিন্তু নদ শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের পরিমাণ কমে গেছে। অনেক জেলে পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে, আবার কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করেছেন। তিনি বলেন, বর্ষার নতুন পানিতে এখনো পুঁটি, ট্যাংরা, ছোট চিংড়িসহ বিভিন্ন ছোট মাছ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “ব্রহ্মপুত্র খনন প্রকল্প শুরু হওয়ার সময় আমরা আশা করেছিলাম, নদটি আবার তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে। কিন্তু আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। নাব্যতা ফিরিয়ে আনার চেয়ে বালু উত্তোলনই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে আমাদের মনে হয়েছে। এই বালুকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেটও গড়ে উঠেছে। আমরা চাই, সঠিক পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নদটি খনন করা হোক।”
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, “ময়মনসিংহের মা ব্রহ্মপুত্র দীর্ঘদিন ধরে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষায় কিছুটা পানি থাকলেও মৌসুম শেষ হলে আবার শুকিয়ে খালের মতো হয়ে যায়। নদীর গুরুত্ব না বুঝেই আমরা একে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।”
তিনি অভিযোগ করেন, খননের নামে নদ দখল ও বালু বাণিজ্য চলছে। পরিকল্পিত খননের মাধ্যমে নদটির প্রাণ-প্রকৃতি ফিরিয়ে আনার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। প্রকল্পের কাজ ও ব্যয়ের বিষয়ে কঠোর তদারকির পাশাপাশি অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনায় নদ-নদী খননের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের খনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএ এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং নদী রক্ষা কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে। খননকাজ পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বর্ষার পানিতে এখন যৌবন ফিরে পাওয়া ব্রহ্মপুত্র যেন ময়মনসিংহবাসীকে আবারও তার পুরোনো ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই প্রাণচাঞ্চল্য যেন শুধু কয়েক মাসের বর্ষার পানিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। পরিকল্পিত খনন, দখল ও দূষণ রোধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে ব্রহ্মপুত্র হয়তো সত্যিকার অর্থেই ফিরে পাবে তার হারানো প্রাণ ও যৌবন।



