কাজী শাখাওয়াত হোসেন
চার বছর পর পর যখন ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের দামামা বাজে, তখন সুদূর লাতিন আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোর মতোই এক অদ্ভুত জ্বরে আক্রান্ত হয় পলিবিধৌত বদ্বীপ বাংলাদেশ। নিজ দেশ খেলছে না, খেলার কোনো সম্ভাবনাও নিকট অতীতে ছিল না, তবুও ১৬ কোটির এই দেশে ফুটবলকে ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা বিশ্বের যেকোনো ফুটবল খেলুড়ে দেশের জন্য ঈর্ষণীয়। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এই উন্মাদনা ছুঁয়ে যায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মতো ফুটবল পরাশক্তিদেরও। কিন্তু এই আকাশচুম্বী ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি চিরন্তন হাহাকার— “আমাদের বাংলাদেশ কবে খেলবে বিশ্বকাপে?”
বাঙালির ফুটবল প্রেম ও বৈশ্বিক বিস্ময়:
বিশ্বকাপের সময়ে বাংলাদেশের অলিতে-গলিতে ঝুলতে থাকা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সের হাজার হাজার পতাকা কেবলই এক মাসের বিনোদন নয়, এটি বাঙালির রক্তে মিশে থাকা ফুটবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ। নিজ বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করে বহুতল ভবনের চূড়া পর্যন্ত প্রিয় দলের পতাকায় ছেয়ে ফেলা, প্রিয় খেলোয়াড়ের বিশালাকার কাটআউট তৈরি করা কিংবা দল বেঁধে বড় পর্দায় খেলা দেখা— এ যেন এক সার্বজনীন উৎসব।
গত কয়েকটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এই নিখাদ ফুটবল প্রেম বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। আর্জেন্টিনার ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে, তা স্বয়ং আর্জেন্টিনার সরকার ও সে দেশের মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে পুনরায় আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু হয়েছে এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ফিফার অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতেও বারবার স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের সমর্থকদের ছবি ও ভিডিও।
সোনালী অতীত ও বর্তমানের ধূসর বাস্তবতা:
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার স্বপ্নকে আকাশকুসুম মনে হতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের একটা গৌরবময় অতীত ছিল। সত্তুর ও আশির দশকে ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ মানেই ছিল টানটান উত্তেজনা, টিকিটের জন্য হাহাকার। সালাউদ্দিন, আসলাম, কায়সার হামিদদের মতো কিংবদন্তি ফুটবলারদের পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকত গোটা দেশ। এশিয়ান ফুটবলেও বাংলাদেশের সমীহ জাগানিয়া এক অবস্থান ছিল।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় ক্রিকেট যখন এ দেশে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছে, ফুটবল তখন হারিয়েছে তার জৌলুস। ঘরোয়া ফুটবলের দীনতা, পাইপলাইনে মানসম্মত খেলোয়াড়ের অভাব, অপরিকল্পিত একাডেমি ব্যবস্থা এবং বাফুফের (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব এ দেশের ফুটবলকে পিছিয়ে দিয়েছে বহু দূরে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮০-এর কোঠায় থাকা বাংলাদেশ দলের জন্য বিশ্বকাপ কেবলই দূর আকাশের তারা।
৪৮ দলের বিশ্বকাপ: নতুন আশার আলো?
ফিফা বিশ্বকাপের পরিধি এখন ৪৮ দলে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে এশিয়া মহাদেশ থেকে আগের চেয়ে বেশি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও এই বর্ধিত কোটাতেও বাংলাদেশের সরাসরি খেলার সম্ভাবনা এখনই তৈরি হয়নি, তবে এটি এশিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি নতুন অনুপ্রেরণা।
বাংলাদেশ যদি এই সুযোগের অংশ হতে চায়, তবে সবার আগে প্রয়োজন র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের অবস্থানের নাটকীয় উন্নতি। এশিয়া কাপের মূল পর্বে নিয়মিত খেলা এবং সাফ অঞ্চলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমেই কেবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত বাছাই পর্বের মূল লড়াইয়ে নামার স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
স্বপ্ন পূরণের রোডম্যাপ: যা করা প্রয়োজন..
বিশ্বকাপে লাল-সবুজ জার্সি দেখতে হলে শুধু আবেগে ভেসে গেলে চলবে না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা:
১. তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণ: জেজেএস (জেসি কাপ), অনুর্ধ্ব-১৪, অনুর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টগুলো নিয়মিত এবং সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজন করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভা খুঁজে এনে তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. বিশ্বমানের একাডেমি ও অবকাঠামো: প্রতিটি বিভাগে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা জরুরি। যেখানে শুধু ফুটবল খেলা নয়, আধুনিক ডায়েট, ফিটনেস ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
৩. ঘরোয়া ফুটবলকে আকর্ষণীয় করা: বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (BPL) ও অন্যান্য ঘরোয়া আসরগুলোকে আরও পেশাদার এবং আকর্ষণীয় করতে হবে যাতে দর্শক আবার মাঠে ফেরে।
৪. বিদেশি লিগে খেলার সুযোগ: দেশীয় ফুটবলারদের প্রতিভা বিকাশের জন্য বিদেশি উন্নত লিগগুলোতে খেলার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
৫. দীর্ঘমেয়াদী বাজেট ও স্পন্সরশিপ: ফুটবল উন্নয়নে সরকারি বাজেটের পাশাপাশি বেসরকারি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পন্সর হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে।
উপসংহার :-
বাঙালির ফুটবল প্রেম এক চিরন্তন সত্য। যে জাতি অন্য দেশের জন্য রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে, সেই জাতির যুবকেরা যদি একদিন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়, তবে দেশের মানুষের সমর্থন কোন উচ্চতায় পৌঁছাবে তা সহজেই! অনুমেয়। একদিন কোটি কোটি বাঙালির কণ্ঠ চিরে ধ্বনিত হবে— “বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!”। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আজ থেকেই শুরু হোক সঠিক পথচলা। ফুটবলের পুনর্জাগরণ ঘটুক আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে।




