নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
গ্যাস সংকটের কারণে ময়মনসিংহে দিন-রাত ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের লাগাতার আসা-যাওয়ায় নগর ও উপজেলার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ও ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ নগরী ছাড়াও গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, ভালুকাসহ বিভিন্ন উপজেলায় কয়েক দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রাতের বেলাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অসহনীয় গরমে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
ময়মনসিংহ নগরীর মাসকান্দা এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “দিনে কাজ করে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাব, সেই সুযোগও নেই। রাতের পর রাত বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে ঘরের ভেতরে থাকা যায় না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
নগরীর আকুয়া এলাকার শ্রমজীবী জসিম উদ্দিন বলেন, “সারাদিন রিকশা চালিয়ে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। রাতে বাসায় গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ নেই। ঘুম হয় না। পরদিন আবার কাজ করতে বের হতে হয়। গরম আর লোডশেডিংয়ে জীবনটাই অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।”
শুধু শ্রমজীবী মানুষই নয়, লোডশেডিংয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও। বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দোকান ও কারখানায় বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বাড়তি খরচ হওয়ায় ব্যবসার ব্যয় বেড়ে গেছে।

ময়মনসিংহ নগরীর একটি ফটোকপি ও কম্পিউটার দোকানের ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জেনারেটর চালালে খরচ বাড়ে, আবার সব সময় জেনারেটর চালানোও সম্ভব নয়। গ্রাহক অপেক্ষা না করে অন্য দোকানে চলে যান। প্রতিদিনই ক্ষতি হচ্ছে।”
একটি ক্ষুদ্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের মালিক সোহেল মিয়া বলেন, “বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেই আমাদের বেশির ভাগ কাজ। ঘন ঘন লোডশেডিং হলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছি না। এ অবস্থা চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।”
এদিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ ও ভালুকাসহ বিভিন্ন উপজেলায় সড়কের পাশে নতুন বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এসব অবকাঠামো নির্মাণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সেই আশায় ভাটা পড়েছে।
ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং লোডশেডিং বেড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।”
তবে কবে নাগাদ ময়মনসিংহবাসী এই ভোগান্তি থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ সংকট ও তীব্র গরমের এই দ্বিমুখী চাপ থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

