ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহে জুয়েলারি দোকানগুলোতে কমেছে ক্রেতার উপস্থিতি। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতনসহ ব্যবসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে, কাজের অর্ডার কমে যাওয়ায় আয় হারাচ্ছেন স্বর্ণালঙ্কার কারিগররা। তাঁদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ পরিস্থিতিতে শতাধিক কারিগর ও তাঁদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

ময়মনসিংহের বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানে এখন ক্রেতার অপেক্ষায় সময় কাটছে বিক্রেতাদের। দু-একজন ক্রেতা দোকানে এলেও সোনার দাম শুনে দরদাম করে ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। ফলে বিয়ে ও পূজা-পার্বণসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়েও প্রত্যাশিত বেচাকেনা হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে সোনার উচ্চমূল্য, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচ সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বর্ণালঙ্কার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যাঁরা বিয়ে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য গয়না কিনতেন, তাঁদের অনেকে এখন কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ নতুন গয়না না কিনে পুরোনো গয়না দিয়েই প্রয়োজন মেটাচ্ছেন।

বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৮ হাজার ৩১ টাকা, ২১ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৮ টাকা। উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে স্বর্ণালঙ্কার।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান, বেচাকেনা কমলেও দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতনসহ নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক চাপে পড়েছেন। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
স্বর্ণ ব্যবসায়ী দেবল আদিত্য বলেন, “আগে দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা ছিল। এখন অনেকেই দাম জানতে আসেন, কিন্তু দাম শুনে কিনতে পারেন না। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় দোকানের খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী জয় সাহা বলেন, “দোকান চালাতে প্রতিদিনই খরচ হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বিক্রি নেই। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হবে।”

স্বর্ণালঙ্কার তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের অবস্থাও নাজুক। গয়না তৈরির অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেকের নিয়মিত কাজ নেই। কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পাওয়া কারিগরদের আয়ও কমে গেছে। কেউ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, আবার কেউ সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
স্বর্ণালঙ্কার কারিগর বাসু দেব বলেন, “আগে নিয়মিত কাজ থাকত, আয় দিয়ে সংসার চলত। এখন কাজ কমে যাওয়ায় অনেক দিন বসে থাকতে হয়। সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অন্য কাজের কথা ভাবতে হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কাজের অভাবে কারিগরদের পেশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে তাঁদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার তৈরির কাজে দক্ষ জনবল হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

সংকট কাটিয়ে উঠতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা স্বর্ণের বৈধ আমদানি ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, স্বর্ণ সংগ্রহ ও ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে এ খাতে স্বাভাবিক বেচাকেনা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি শংকর সাহা বলেন, স্বর্ণের বাজারে মন্দার কারণে ব্যবসায়ীরা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর উদ্যোগ নিলে জুয়েলারি ব্যবসায় গতি ফিরতে পারে। একই সঙ্গে কাজের সুযোগ বাড়লে আর্থিক সংকটে থাকা কারিগররাও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।

