ফসলের সহনশীলতা বাড়াতে কার্যকারী হবে সামুদ্রিক শৈবাল

0
220

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের কৃষিজমি দিন দিন আরও প্রতিকূল হয়ে উঠছে। লবণাক্ততা, খরা ও তাপমাত্রাজনিত চাপের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমাধান খুঁজতে সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক বায়োস্টিমুল্যান্ট নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সম্মেলন হলে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অজৈব চাপ মোকাবিলায় ফসলের সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক বায়োস্টিমুল্যান্ট ব্যবহারের পরিবেশবান্ধব কৌশল’ শীর্ষক এক উদ্ভাবনী কর্মশালায় এই গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালের হিসাবে দেশের প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত, যা উপকূলীয় অঞ্চলের মোট আবাদি জমির প্রায় ৩০ শতাংশ। পাশাপাশি দেশের প্রায় ৪১ থেকে ৫০ শতাংশ এলাকা কোনো না কোনো সময় খরার কবলে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।

কর্মশালার প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষি খাত আজ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সংকট মোকাবিলায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক বায়োস্টিমুল্যান্ট ব্যবহার করে ফসলের সহনশীলতা বাড়ানোর এই গবেষণা কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে তিনি গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার ও বাকৃবির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তাহজিব-উল-আরিফ।

তিনি জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক শৈবাল পাওয়া যায়, যা এখনো যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। বর্তমানে দেশে ৪৭ প্রজাতির সবুজ, ৫৯ প্রজাতির বাদামী এবং ৯৪ প্রজাতির লাল শৈবাল শনাক্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এসব শৈবালে থাকা ফেনোলিক যৌগ, পলিস্যাকারাইড এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণার অংশ হিসেবে হাইপনিয়া, গ্রাসিলারিয়া, সারগাসাম ও এন্টারোমর্ফা প্রজাতির শৈবাল থেকে কার্যকর নির্যাস তৈরি করে ধান ও গমের ফলন বৃদ্ধিতে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কম্পিউটেশনাল (ইন সিলিকো) পদ্ধতিতে শৈবালের জৈব সক্রিয় উপাদানগুলোর কর্মপদ্ধতিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

গবেষণা দলের সদস্য অধ্যাপক ড. শায়লা শারমিন ও অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হান্নান জানান, এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগে ফসলের শরীরবৃত্তীয় ও আণবিক স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে গমের জাত ‘বিডব্লিউএমআরআই গম-১’-এর ওপর গ্রাসিলারিয়া শৈবাল নির্যাসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। গবেষণা শেষে ২ থেকে ৩টি কার্যকর বায়োস্টিমুল্যান্ট বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-২, ১৩ ও ১৪) অর্জনে সহায়ক হবে।

প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শায়লা শারমিনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মাসুম আহমাদ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ উদ্দীন ভূঁঞা এবং বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here