নিজস্ব প্রতিনিধি
সরকারি নিয়মে ইজারা নেওয়া জলমহলে মাছ চাষ ও আহরণ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন ইজারাদার ও মৎস্যজীবীরা। তাঁদের অভিযোগ, জলমহলটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা চলছে। এমনকি ইজারাদারের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং টাকা না দিলে জলমহল ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম রতনের বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার পাঁচকাহনীয়া (ভূগলী) জলমহল। অভিযোগের প্রতিবাদে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বড়িবাড়ী ফেরিঘাট এলাকায় মানববন্ধন করেছেন জলমহলের ইজারাদার, মৎস্যজীবী ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাঁদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ইজারাদারদের দাবি, সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকায় পাঁচকাহনীয়া জলমহলটি তাঁরা ইজারা নিয়েছেন। ইজারা পাওয়ার পর মাছ চাষ ও আহরণের জন্য সেখানে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু জলমহলে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই বিভিন্নভাবে বাধা, ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

ইজারাদার মো. ফরহাদের অভিযোগ, ইজারা পাওয়ার পর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম রতন তাঁকে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে জলমহল ছেড়ে দিতে হবে বলেও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।
এ ছাড়া জলমহলে জেলেদের নামতে বাধা, ইজারাদারের লোকজনকে মারধর এবং পাহারায় থাকা একটি নৌকা ভাঙচুর করে মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন ইজারাদারপক্ষের লোকজন।
বড়িবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মাখন ও বিএনপি নেতা সামিউল হাসান রাব্বী বলেন, বৈধ ইজারা থাকার পরও ইজারাদার ও জেলেরা স্বাভাবিকভাবে জলমহলে কাজ করতে পারছেন না। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জলমহলকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।

ইটনা কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর শেখ বলেন, জলমহলে পাহারারত কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম রতন। ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মারধর কিংবা নৌকা ছিনতাইয়ের অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন।
আমিনুল ইসলাম রতন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা কোনো একটি অভিযোগও প্রমাণিত হলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ইজারাদারদের সংগঠনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রতন। তাঁর দাবি, তিনি কোনো আইন বা আদালতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের বক্তব্যের ভিত্তিতেই তিনি এ বিষয়ে অবস্থান নিয়েছেন।
ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই বৈধ ইজারাদারকে জলমহল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইজারাদাররা সেখানে কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হলে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এখন পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ, হামলা, নৌকা ভাঙচুর কিংবা জলমহল দখলের চেষ্টার অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্তের ফল প্রকাশ হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ইজারা পাওয়ার পরও কেন ইজারাদারদের মাছ আহরণে বাধার অভিযোগ উঠছে? ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগের কোনো প্রমাণ বা যোগাযোগের রেকর্ড আছে কি না, হামলা ও নৌকা ভাঙচুরের ঘটনায় কারা জড়িত—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
জলমহলটির নিয়ন্ত্রণ ও ইজারা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

