দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং কর্মকর্তা বদলি—সব মিলিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরে অস্বচ্ছতা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ বহুদিনের। তবে নতুন সরকারের সময় এই খাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর খাদ্য বিভাগে একটি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও আলোচনা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের অনুপস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পর খাদ্যমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ এবং সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এলএসডি (লোকাল সাপ্লাই ডিপো) গুদামগুলোকে ঘিরে একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গুদামে দায়িত্ব পেলে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে। ফলে এসব পদে পদায়নের জন্য অঘোষিতভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে বদলি বা পদায়নের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের কিছু আঞ্চলিক কার্যালয়ে এমন বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও এতদিন তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ তানভীর হোসেনকে ঘিরেও অনিয়ম ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে আর্থিক সুবিধা নিত। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন শুদ্ধি অভিযানে খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ, বস্তা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়, কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া, পরিবহন ব্যয় এবং ঠিকাদারি কার্যক্রম তদন্তের আওতায় আনা হতে পারে।
সম্প্রতি খাদ্য সচিব মো. ফিরোজ সরকার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে এসব বিষয়ে কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, খাদ্য বিভাগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই এখানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, সরকার খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ ও ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এজন্য প্রশাসনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার যদি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তবে খাদ্য খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।




