রাস্তায় পড়ে থাকা পরিচয়হীন মা-বাবার শেষ আশ্রয় ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’

0
167

কেউ পড়ে ছিলেন রাস্তায়, কেউ হাসপাতালের বারান্দায়। কারও শরীরে ধরেছিল পচন, কারও চোখে ছিল অসহায় শূন্যতা। নাম-পরিচয়হীন এসব মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর মতো ছিল না কোনো স্বজন। অথচ একসময় হয়তো তাদের হাত ধরেই বড় হয়েছে সন্তানরা।

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’ এখন এমন অসহায় ও পরিচয়হীন মা-বাবাদের শেষ আশ্রয়স্থল। ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই মানবিক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন সমাজকর্মী আবদুল মালেক। ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের গজন্দর গ্রামের বাসিন্দা হলেও তিনি ভালুকাতেই শুরু করেন এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ।

বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রমটিতে আশ্রয় নিয়েছেন ২২ জন বৃদ্ধা ও ৫ জন বৃদ্ধ। তাদের অধিকাংশই মানসিক ভারসাম্যহীন এবং পরিচয়হীন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে আশ্রয় পেয়েছেন ৫৭ জন মানুষ। এর মধ্যে ১৭ জন মারা গেছেন এবং পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর ১৩ জন ফিরে গেছেন পরিবারের কাছে।

মা দিবসে যখন অনেকে মায়ের সঙ্গে ছবি তুলে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, তখন এই আশ্রয়কেন্দ্রের অনেক বৃদ্ধ নারীই জানেন না তাদের সন্তান কোথায় আছে। স্মৃতির অনেক অংশ হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। এখন এই বৃদ্ধাশ্রমই তাদের পরিবার, আর সেবাযত্ন করা মানুষগুলোর মাঝেই তারা খুঁজে পান আপনজনের ছায়া।

maa5 20260510084326 1

আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেউ নীরবে বসে আছেন, কেউ দূরে তাকিয়ে অস্পষ্টভাবে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। তাদের পাশে ছায়ার মতো ঘুরে ঘুরে খোঁজখবর নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মালেক। এখানে থাকা অনেকেই উদ্ধার হয়েছেন রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল কিংবা রাস্তার পাশ থেকে। অধিকাংশেরই অতীত অজানা।

প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকেই সেবাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন ২৪ বছর বয়সী জেরিন আক্তার (রিয়া)। বৃদ্ধ মানুষগুলোর দেখভাল করাই এখন তার জীবনের বড় দায়িত্ব।

রিয়া বলেন, “আমি তাদের গোসল করাই, খাবার খাওয়াই, অসুস্থ হলে সেবা করি। আমার নিজের মা নেই, তাই এখানকার মানুষগুলোকেই মা-বাবা মনে করে সেবা করি।”

বৃদ্ধাশ্রমটির প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মালেক জানান, ঢাকায় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার সময় থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ মানুষদের জন্য কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে।

তিনি বলেন, “রেলস্টেশন ও বিভিন্ন জায়গায় অসহায় বৃদ্ধ মানুষদের পড়ে থাকতে দেখে তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন অনুভব করি। সেই চিন্তা থেকেই ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই বৃদ্ধাশ্রমের যাত্রা শুরু।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের এখানে যাদের আনা হয়, তাদের অধিকাংশই রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ। কেউ বাসস্ট্যান্ড থেকে, কেউ হাসপাতাল থেকে, আবার কাউকে পাঠায় থানা বা সমাজসেবা অফিস। এখানে এনে তাদের চিকিৎসা, সেবা ও পরিচর্যা করা হয়। আমরা তাদের নিজের মা-বাবার মতোই যত্ন করি।”

ভালুকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুবেল মন্ডল বলেন, “অসহায় ও পরিচয়হীন বৃদ্ধ মানুষদের পারিবারিক পরিবেশে সেবা দিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি একটি মহৎ উদ্যোগ, সমাজসেবা অধিদপ্তর সবসময় তাদের পাশে রয়েছে।”

মানবিকতা আর ভালোবাসার ছোঁয়ায় ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’ আজ হয়ে উঠেছে পরিচয়হীন বহু মা-বাবার শেষ ভরসার ঠিকানা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here