মো: আবুল মনসুর, নিজস্ব প্রতিবেদক
সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ঐতিহ্যের শহর ময়মনসিংহ আজ নাগরিক ভোগান্তিতে নাকাল। যানজট, খেলার মাঠের অভাব, জলাবদ্ধতা ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থার কারণে শহরটি দ্রুত বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। ২০১৮ সালে সিটি করপোরেশনে পরিণত হওয়া এই নগরী এখনও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে শূন্যতার শিকার।

শহরের প্রায় ছয় লাখ মানুষ বাস করছে, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জন্য থাকা উচিত ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা; ময়মনসিংহে তা মাত্র ২ বর্গমিটার। ফলে শিশুদের খেলার জায়গা নেই, প্রবীণরা হাঁটাহাঁটির জন্য নিরাপদ পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। অনেক খোলা জায়গা ইতিমধ্যেই আবাসন ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় দখল হয়েছে।

বৃষ্টির সময় শহরের প্রধান সড়কগুলো হাঁটু পানিতে ভরে যায়। সরু ও ভরাট ড্রেনেজ পদ্ধতির কারণে পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়। এছাড়া বিশুদ্ধ পানির অভাবও তীব্র হচ্ছে। নগরের রাস্তায় প্রতিদিন ২২০ টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বড় অংশ ঠিকমতো নিষ্পত্তি হয় না। রাস্তার পাশে ও খোলা ড্রেনে ফেলা আবর্জনা থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণু। আধুনিক ল্যান্ডফিল বা সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প কার্যকর হয়নি।
যানজটও নিত্যদিনের সমস্যা। অটোরিকশা, রিকশা, প্রাইভেট গাড়ি ও ট্রাক বিনা নিয়ন্ত্রণে চলাচল করছে। ফুটপাত দখল, পর্যাপ্ত পার্কিং নেই, আলাদা লেন নেই এছাড়াও ফুটপাতে ব্রাম্মমান হকারের ব্যাবসা ; এসব কারণেই নগরীর প্রধান সড়কগুলো প্রায় সারাদিনই যানজটে স্থবির।
নগরীর ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন,
“প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে, মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।”
শহরের শিশু ও কিশোরদের খোলা স্থানে খেলার সুযোগ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অভিভাবক আসমা আক্তার বলেন,
“বাচ্চারা বাধ্য হয়ে রাস্তায় খেলছে। এটি ঝুঁকিপূর্ণ, আবার তাদের স্বাভাবিক বিকাশও ব্যাহত হচ্ছে।”
প্রবীণ শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“আগে বৃষ্টির পানি খালে চলে যেত। এখন সব জায়গা দখল হওয়ায় রাস্তাই হয়ে গেছে পানির ভান্ডার।”
নগর বিশেষজ্ঞ ড. তানভীর আহমেদ সতর্ক করেছেন,
“যে হারে এলোমেলোভাবে ভবন নির্মাণ হচ্ছে, আগামী ১০ বছরে ময়মনসিংহ পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে যদি এখনই মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ না করা হয়।”

বিশেষজ্ঞরা এ সমস্যা সমাধানের জন্য বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছেন তার মাঝে উল্ল্যেখযোগ্য হলো ;
নগরে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (MDA) গঠন করা জরুরি।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণে রিকশা-অটোর জন্য পৃথক লেন, পর্যাপ্ত পার্কিং জোন এবং আধুনিক গণপরিবহন চালু করতে হবে।
খোলা জায়গা সংরক্ষণের জন্য দখলকৃত মাঠগুলো উদ্ধার ও প্রতিটি ওয়ার্ডে নতুন পার্ক স্থাপন প্রয়োজন।
ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বৈজ্ঞানিকভাবে করা, খাল ও পুকুর দখলমুক্তকরণ ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক রিসাইক্লিং ও সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে রূপান্তর করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে জোনিং আইন বাস্তবায়ন ও বহুতল ভবনে সবুজ এলাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ময়মনসিংহ আজও শিক্ষার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। তবে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শহরটি দ্রুত বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য বাঁচাতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে এখনই পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন অপরিহার্য




