ময়মনসিংহে পশুর হাটে ক্রেতা কম, হতাশ খামারিরা

0
163

আর মাত্র কয়েকদিন পর ঈদুল আজহা। কোরবানিকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহজুড়ে জমে উঠতে শুরু করেছে দেড় শতাধিক পশুর হাট। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খামারিরা গরু-ছাগল নিয়ে হাটে আসছেন। তবে হাটে পশুর সরবরাহ বাড়লেও সেই তুলনায় ক্রেতার উপস্থিতি কম। ফলে একদিকে যেমন ক্রেতারা গরুর দামকে নাগালের বাইরে বলছেন, অন্যদিকে বিক্রেতারাও কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন।

বুধবার (২০ মে) জেলার অন্যতম বড় মুক্তাগাছার নতুন বাজার পশুর হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সকাল থেকেই হাটজুড়ে ছিল গরু-ছাগলের সারি। কেউ গরুর দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ আবার সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছেন। কিন্তু পুরো হাটজুড়ে ছিল এক ধরনের ধীরগতি। পশু উঠেছে অনেক, কিন্তু ক্রেতা তুলনামূলক কম।

ময়মনসিংহ জেলায় কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে মোট ১৫২টি স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাট বসে। এর মধ্যে মুক্তাগাছার নতুন বাজার পশুর হাটকে জেলার সবচেয়ে বড় ও প্রধান গরুর হাট হিসেবে ধরা হয়। প্রতি বুধবার বসা এই হাটে দেশি জাতের ছোট, মাঝারি ও বড় গরুর পাশাপাশি ছাগল বিক্রি হয়। শুধু স্থানীয় খামারিরাই নন, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক পশু নিয়ে আসেন বিক্রেতারা।

মুক্তাগাছা উপজেলার তারাটি এলাকার মো. চাঁন মিয়া ৫ মাস আগে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কেনা একটি কালো গাভী এবার বিক্রির জন্য হাটে এনেছেন। বাড়িতে তার মোট চারটি গরু রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পালন করেও বাজারে আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না তিনি। ক্রেতারা গরুটির দাম বলছেন মাত্র ৮০ হাজার টাকা।

চাঁন মিয়া বলেন, ১ লাখ ২৫ দিয়ে কিনছিলাম। ৫ মাস পেলে দাম কয় ৮০ হাজার। এই টাকায় বিক্রি করলে তো ঘাটতি। বাজারে ক্রেতাও কম। বিক্রি নাই।

একই হাটে ফুলবাড়িয়া উপজেলার ধামর এলাকার জাহিদ হাসানও একটি লাল রঙের ষাঁড় নিয়ে এসেছেন। প্রায় এক বছর ধরে ঈদ উপলক্ষ্যে গরুটি পালন করেছেন তিনি। ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিক্রির আশা করছেন। কিন্তু দিনভর কেউ গরুটির দামও বলেননি বলে জানান তিনি।

জাহিদ হাসান বলেন, আজকের বাজারে গরু বিক্রি করা যাবে না। একটা ষাঁড় আর একটা গাভী নিয়ে আসছিলাম। গাভী ১ লাখ ৩০ হাজার দাম করছে। ১ লাখ ৬০ হাজার বিক্রির চিন্তা করতেছি। কিন্তু ষাঁড়ের কোনো দামই করছে না। আজকে বাজারে গরু অনেক বেশি উঠেছে। কিন্তু ক্রেতা নেই।

জামালপুর সদর উপজেলার হামিদপুর থেকে আসা মো. স্বপনও দুটি কালো রঙের ষাঁড় নিয়ে হাটে এসেছেন। ঈদ উপলক্ষ্যে প্রায় এক বছর ধরে গরু দুটি পালন করেছেন তিনি। একটি গরুর দাম চাচ্ছেন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, অন্যটির দাম আড়াই লাখ টাকা।

তিনি বলেন, ষাঁড় দুটি ১ বছর যাবত পালন করেছি। আজকে বাজারের পরিস্থিতি খারাপ। বাজারে ক্রেতা কম। দূর থেকে আসছি। দুইটা মিলিয়ে ৫ লাখ হলে বিক্রি করে দেবো। তবে ঈদের আরও কাছাকাছি সময়ে ক্রেতা বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার পলাশতলী এলাকার মো. জহিরুল ইসলাম বাড়িতে ১০টি গরু পালন করেন। বুধবারের হাটে তিনি বড় আকারের তিনটি ষাঁড় নিয়ে এসেছিলেন। এর মধ্যে দুটি বিক্রি করেছেন। একটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় এবং অন্যটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাকি আরেকটির দাম চাচ্ছেন ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

জহিরুল ইসলাম বলেন, আজকে বাজার ভালো না। বেচাকেনা কম হচ্ছে। ঈদ যত কাছে আসবে, ক্রেতা তত বাড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, অনেকে জায়গা স্বল্পতা, পালন করতে না পারার জন্য এখনই গরু কিনতে হাটে আসেনি। ঈদের ২-১ দিন আগে গরু বিক্রি বাড়বে।

হাটে ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও অনেকেই শুধু ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন, দাম মিলছে না বলে কিনছেন না। উপজেলার মাইজহাটি এলাকার হাবিবুর রহমান একটি ধূসর রঙের মাঝারি আকারের ষাঁড় কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। গরুটির দাম পড়েছে ৫৪ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, গরুটি পালন করার জন্য নিলাম। দাম অনুযায়ী ভালোই। তবে ঈদের বাজারের মতো লাগছে না। গরু অনেক উঠছে কিন্তু কিনার মানুষ নাই।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জালিলুল হাসান সৈকত কোরবানির জন্য গরু কিনতে এসেছেন মুক্তাগাছার হাটে। বড় আকারের গরু তার পছন্দ হওয়ায় দেশি গরুর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান জাতের গরুও দেখছিলেন তিনি। একটি কালো রঙের ষাঁড় তার পছন্দ হলেও দাম চাওয়া হয় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ তিনি বাজেট রেখেছেন ১ লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

তিনি বলেন, গত হাটের তুলনায় এই হাটে গরু উঠেছে বেশি, কিন্তু বিক্রি কম। সামনে আরেকটা হাট থাকায় সবাই সেই হাটের দিকে তাকিয়ে আছে।

হাটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাজারের ইজারাদার তাওসিফ ইবনে মান্নান বলেন, আজকে ক্রেতা সমাগম কম। যারা প্রকৃতপক্ষে কোরবানি দেবেন তারা একেবারে নাই বললেই চলে। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা আসছেন। গরু কিনে অন্যান্য হাটে বিক্রি করবেন। যারা কোরবানি করবেন তারা এখনো আসেন নাই। তারা হইতো আগামী হাটে আসবেন। বেচাকেনাও বাড়বে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলায় কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ১৪৮টি। বিপরীতে জেলার চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ২৬৬টি পশুর। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় জেলায় ৪৪ হাজার ৮৮২টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।

প্রস্তুত করা পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৪৭টি গরু। এছাড়াও রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬৬টি ছাগল, ৫ হাজার ৩৪৪টি ভেড়া এবং ৮৮৬টি মহিষ।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, ঈদকে ঘিরে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে, আমাদের মাঠপর্যায়ের সহকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পুরো জেলার জন্য ৫৬টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করছি, যারা কোরবানির হাটগুলোতে কাজ করবেন।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ গবাদি পশু আছে কোরবানির যোগ্য তাই বাইরে থেকে যেন কোনো পশু অবৈধভাবে না আসে সে জন্য তৎপর রয়েছি। আমরা চাই আমাদের খামারি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং তারা যাতে সঠিক দাম পায়।

কোরবানির পশুবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা ও হাটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কাজ করছে পুলিশ প্রশাসন।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কোরবানির পশুবাহী গাড়ি কোথাও যেন আটকে না থাকতে হয় এবং হয়রানির শিকার না হয় সে জন্য আমরা তৎপর রয়েছি। অপরাধী চক্রের অপৎপরতা রোধ ও জাল টাকার বিস্তার ঠেকাতে হাটগুলোতে পোশাকে পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here