নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ :
ময়মনসিংহ শহরে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট এখন আর শুধু ভোগান্তির বিষয় নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে এক গভীর প্রশ্নে—দেশের নিজস্ব খনিজ সম্পদ গ্যাস কোথায় যাচ্ছে? সংকটের পেছনে কি সক্রিয় কোনো সিন্ডিকেট, নাকি অবৈধ সংযোগের জাল, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরি করে মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারাএই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নগরজুড়ে।
বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় চুলা জ্বলছে না দিনের পর দিন। শহরের অসংখ্য গৃহিণী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও রান্না করতে পারছেন না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। মধ্যরাতে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তা স্থায়ী হয় না—এ যেন এক অদৃশ্য লুকোচুরি।
শুধু আবাসিক খাত নয়, পরিবহন খাতেও সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ময়মনসিংহে ১১টি সিএনজি স্টেশনের মধ্যে অধিকাংশই কার্যত অচল। যেগুলো খোলা রয়েছে, সেখানে রাতভর লাইন দিয়েও গ্যাস মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। এতে করে আয় কমে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্যাস সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি, এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পথ তৈরি করা হচ্ছে। “সংকট নয়, এটি পরিকল্পিত”—এমন অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে, আবাসিক খাতে নজরদারির ঘাটতিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সংকট থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কিছু শিল্পকারখানায় গোপনে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে বৈধ গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর লাভবান হচ্ছে একটি অসাধু চক্র।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।
তবে সংস্থাটির তথ্যমতে, জেলায় ২২টি শিল্পকারখানা, ১৪টি ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট, ১০টি সিএনজি স্টেশন এবং ১৩৫টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। আবাসিক খাতে মিটারযুক্ত ১৯০টি এবং মিটারবিহীন প্রায় ২৫ হাজার সংযোগ থাকলেও অবৈধ সংযোগের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই—যা আরও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির কারণেই এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট তদন্ত ছাড়া প্রকৃত কারণ উদঘাটন সম্ভব নয়।
এদিকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন—নিজস্ব গ্যাসের দেশে এমন সংকট কেন? দায় নেবে কে? আর কবে মিলবে স্বস্তি?
দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ তদন্ত, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সংকট নিরসনের জোর দাবি জানিয়েছেন ময়মনসিংহবাসী।

