খোকন দাসের শেষকৃত্য সম্পন্ন, আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

0
187

সারা দিন দোকানে কাজ করে রাতে বাড়ি ফিরছিলেন খোকন চন্দ্র দাস। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে তাঁর ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। চার দিন পর বাড়িতে ফিরেছে তাঁর প্রাণহীন নিথর দেহ।

খোকন দাসের এমন মৃত্যু মানতে পারছেন না আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষ। হামলার ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা ও এলাকার মানুষজন।

নিহত খোকন দাস শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই গ্রামের পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি কেউরভাঙ্গা বাজারে ওষুধ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা করতেন। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি তিলই ঠাকুরবাড়িতে আনা হয়। রাতেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁকে শেষবিদায় জানাতে এবং একবার দেখার জন্য শত শত মানুষ জড়ো হয় ঠাকুরবাড়িতে।গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এরপর সন্ত্রাসীরা তাঁর গায়ে পেট্রলজাতীয় দ্রব্য দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে রাতে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল সকালে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

কনেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য স্বপন গোলদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরাই খোকনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কারা তার ওপরে হামলা করেছিল, তাদের নাম সে বলে গিয়েছে। তার স্বীকারোক্তির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ তারপরেও ওই আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এলাকাবাসীর চাপে পুলিশ ওই রাতেই আসামিদের বাড়িতে অভিযান চালায়। তাদের না পেয়ে তাদের বাবাদের থানায় ধরে নিয়ে আসে। এক দিন পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তারাও তাদের সন্তানদের কোনো সন্ধান পুলিশকে দেয়নি। আসামিদের এখনো কেন ধরা হচ্ছে না, তা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ।আহত অবস্থায় খোকন হামলাকারী দুইজনের নাম বলেছেন। তাঁরা হলেন কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান (২৭) ও সামছুদ্দিন মোল্যার ছেলে রাব্বি মোল্যা (২১)। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ওই ঘটনায় অংশ নেওয়া আরেকজনের নাম জানতে পারে। ওই ব্যক্তি স্থানীয় শহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদার (২৫)। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে থানায় একটি মামলা করা হয়। আহত খোকন দাসের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় ওই তিন তরুণকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

খোকনের স্বজনেরা জানান, গতকাল বিকেলে ঢাকার শাহবাগ থানার অধীনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষ হয়। এরপর তাঁর লাশ নিয়ে স্বজনেরা গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন। রাত সাড়ে আটটার দিকে লাশবাহী গাড়িটি তিলই গ্রামে পৌঁছায়।

‘পুলিশ কেন অবহেলা করছে’
গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে তিলই গ্রামে খোকন দাসের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ছোট্ট একটি উঠানে মাটিতে চাদর পেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে খোকন দাসের নিথর দেহ। পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তাঁর স্ত্রী সীমা। কাঁদতে কাঁদতে তিনি মূর্ছা যাচ্ছিলেন। আবার কখনো ক্ষোভে ফেটে পড়ছিলেন। বারবার বলছিলেন, ‘ঘটনার চার দিন হয়ে গেল। কেন এখনো হামলাকারীদের ধরা হলো না। তাদের ধরতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। পুলিশ কেন অবহেলা করছে? আমার স্বামীকে ওরা পুড়িয়ে মেরেছে। চার দিন হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করেছে, তা আমি দেখেছি। তাঁর শরীরের রক্ত ঝরেছে, সব রক্ত বেরিয়ে গেছে।’

আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষ খোকন দাসের বাড়িতে এসেছেন। তাঁকে শেষবিদায় জানাতে ও একনজর দেখতে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা। খোকন দাসের প্রতিবেশী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করা শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই ঘটনায় যে তিনজনের নাম সামনে এসেছে, তারা এলাকায় বখাটে, জুয়াড়ু ও মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত। পুলিশ কেন তাদের ধরতে পারছে না, বিষয়টি আমরাও বুঝতে পারছি না। ঘটনাটি নিয়ে এলাকার মানুষ শঙ্কিত। পুলিশ আন্তরিক ও তৎপর হলে আসামিদের ধরা সম্ভব হতো। আমরা অবাক হয়ে যাচ্ছি, এমন একটি আলোচিত ঘটনার পরেও আসামিরা ধরা পড়েনি।’ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক গতকাল রাত ৯টার দিকে তিলই গ্রামে খোকন দাসের বাড়িতে যান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসামিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি তাদের ধরার জন্য। তাদের সন্ধান পেতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কাজ করছে।’

ওসি মোহাম্মদ রবিউল হক আরও বলেন, ‘টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য এ হামলা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তদন্ত এসেছে। হামলাকারীদের চিনে ফেলায় পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলযোগে এসেছিল। হয়তো মোটরসাইকেল থেকে পেট্রল বের করে শরীরে ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।’

সংশোধনী

এই প্রতিবেদনে প্রথমে খোকন দাসকে সমাহিত করার কথা বলা হয়েছিল। তথ্যগত ভুলের কারণে শিরোনাম ও ভেতরের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here