অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে শতাব্দী প্রাচীন ‘রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস’, সংরক্ষণের দাবি

0
147

ময়মনসিংহ নগরীর ঐতিহ্যবাহী ও শতাব্দী প্রাচীন স্থাপনা ‘রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস’ এখন চরম অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক জলাধারের অধিকাংশ অংশ ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সংরক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

নগরীর সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় সংলগ্ন ঈশান চক্রবর্তী রোডে অবস্থিত এই ওয়াটার ওয়ার্কসটি নির্মাণ করেন মুক্তাগাছার মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৮৮৯-১৮৯০ সালের দিকে ময়মনসিংহ শহরের মানুষের বিশুদ্ধ খাবার পানির চাহিদা পূরণে তিনি এই জলাধার স্থাপন করেন। এটি ছিল ময়মনসিংহে যান্ত্রিক উপায়ে পানি সরবরাহের প্রথম উদ্যোগ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মহারাজ সূর্যকান্তের স্ত্রী রাজরাজেশ্বরী দেবী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পানি পান করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রীর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে তার নামেই ‘রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস’ প্রতিষ্ঠা করেন মহারাজ।

Mym

ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে নির্মিত এই প্রকল্পে সে সময় প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। নির্মাণ শেষে প্রথম তিন বছর মহারাজার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও ১৮৯৩ সালে এর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় ময়মনসিংহ পৌরসভার কাছে। দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর ধরে নগরীর প্রধান বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই স্থাপনাটি।

তৎকালীন সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন জলাধারে সংরক্ষণ ও পরিশোধনের পর যান্ত্রিক উপায়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো। শুধু পানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবেই নয়, এটি দীর্ঘদিন দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পরিচিত ছিল।

তবে স্বাধীনতার পর নগরীতে নতুন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় ‘রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস’। এরপর কয়েক যুগ ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো এলাকা জুড়ে জন্মেছে আগাছা, পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। ভেঙে পড়েছে স্থাপনার বিভিন্ন অংশ। বর্তমানে এটি দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একসময় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরতে এবং নগরীর ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত এই স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যথাযথ সংস্কার ও পরিচর্যা করলে এটি সহজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি ও দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।

এদিকে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, “ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরাকীর্তি রয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে একের পর এক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কসের অবশিষ্টাংশ দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি।”

সম্প্রতি পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির একটি প্রতিনিধি দল স্থাপনাটি পরিদর্শন করে এর সংরক্ষণের দাবি জানায়। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, এখনো এই স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here