ত্রিশাল-ফুলবাড়িয়া সংযোগে চরম ভোগান্তি, ঝুঁকিতে প্রতিদিনের যাত্রা

0
140

ময়মনসিংহের ত্রিশালের পোড়াবাড়ী এলাকায় খিরু নদীর ওপর থাকা পুরোনো বেইলি ব্রিজ এখন যেন শুধুই জোড়াতালির ওপর টিকে আছে। ভাঙা অংশে বালিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা বসিয়ে কোনোরকমে চলাচল চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা নতুন সেতু পার হতে অনেকেই ব্যবহার করছেন কাঠের তৈরি অস্থায়ী মই। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে ত্রিশাল ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার লাখো মানুষকে।

জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ। এতে দিন দিন বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, পোড়াবাড়ী বাজার এলাকায় খিরু নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো বেইলি ব্রিজটির বিভিন্ন স্থানে পাটাতন সরে গেছে এবং অনেক অংশ ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় স্থানীয়রা ভাঙা জায়গাগুলোতে বালিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা বসিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। পুরো ব্রিজজুড়ে প্রায় শতাধিক বস্তা ব্যবহার করা হলেও দুর্ঘটনার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

অনেক পথচারী ঝুঁকি এড়াতে পাশের নির্মাণাধীন নতুন সেতুর একপাশে কাঠের তৈরি অস্থায়ী মই বেয়ে পারাপার করছেন। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু, শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বয়স্ক মানুষ।

bridge w 20260611160645

স্থানীরা জানান, খিরু নদীর এক পাশে ত্রিশাল উপজেলা এবং অন্য পাশে ফুলবাড়িয়া উপজেলা। দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল বেইলি ব্রিজটি। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে বর্তমানে সেটি অত্যন্ত নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে পুরোনো বেইলি ব্রিজের পাশেই নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল মিয়া বলেন, ‘এই ব্রিজটা দুই উপজেলার লাখ লাখ মাইনষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। শতাধিক ভাঙা-চোরা জায়গায় প্লাস্টিকের বালির বস্তা দিয়া মানুষ চলাফেরা করতাছে। দুর্ঘটনার ডরে অনেক মানুষ পাশের অসমাপ্ত নতুন সেতুতে কাঠের মই লাগাইয়া পারাপার করতাছে। দ্রুত নতুন সেতুর কাম শেষ কইরা চালু না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

পোড়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিপু দাশ বলেন, বেইলি সেতুতে উঠতে ভয় হয়। মনে হয় এই বুঝি সেতুসহ কিংবা পাটাতনসহ নিচে পড়ে যাব। তবুও আতঙ্ক নিয়ে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।

রাণীগঞ্জ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি রুবায়েত হোসেন বলেন, ‘ত্রিশাল পৌর শহরে যাতায়াতের জন্য এই বেইলি ব্রিজটিই আমাদের একমাত্র ভরসা। বিকল্প পথে গেলে অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও টাকা দুইটাই বেশি লাগে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা দূর কইরা নতুন সেতুটা দ্রুত চালু করা দরকার।’

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির কাজ পায়। ২০২৩ সালের আগস্টে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। ওই জমির মালিক ও ওয়ারিশ মিলিয়ে রয়েছেন প্রায় ২০ থেকে ২২ জন।

জমির মালিকদের একজন বাসন্তী রানী চৌধুরী বলেন, জমি অধিগ্রহণে আমার তিন শতকের ভিটে পড়েছে। অধিগ্রহণের টাকা পাইনি। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত জমির দখল ছাড়া হবে না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন বলেন, প্রায় ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে অতিদ্রুতই কাজ শেষ করা যাবে।

ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, নতুন সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ করার কথা থাকলেও জমির মালিকদের বাধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তারা অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত শুধু তাদের জমির অংশেই নয়, প্রকল্পের অন্যান্য অংশেও কাজ করতে দিচ্ছেন না। ওই অংশের কাজ সম্পন্ন করা গেলে সেতুটি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হতো। জমি, স্থাপনা ও গাছপালার মূল্য নির্ধারণ করে অধিগ্রহণের প্রস্তাব ইতোমধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং অবশিষ্ট কাজ শেষ করে নতুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here