হিজাবের আড়ালে অন্ধকার সাম্রাজ্য: বিত্তশালী ও আমলাদের ব্ল্যাকমেইল করতেন ফারহানা রুমি।

0
160

নেপথ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও নসরুল হামিদ বিপু | এবার টার্গেটে ছাত্রদল ও যুবদলের নামধারী সুন্দরীরা।

বিশেষ অপরাধ প্রতিবেদক, ঢাকা:

রাজধানীর অভিজাত পাড়াগুলোতে গড়ে ওঠা বিউটি পার্লার, ফিটনেস এবং স্পা সেন্টারের আড়ালে চলছে ভয়াবহ ‘হানি ট্র্যাপ’ (মধুফাঁদ) ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য। হিজাবের আড়ালে থেকে এই অন্ধকার জগতের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক ফুটবলার মতিউর মুন্নার সাবেক স্ত্রী আলহাজ্ব ফারহানা হোসেন রুমির বিরুদ্ধে।
নিজেকে উদ্যোক্তা ও বিউটি কনসালটেন্ট পরিচয় দিলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার
রঙিন দুনিয়া’র লোমহর্ষক সব তথ্য।

প্রভাবশালী আমলা, রাজনীতিক, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং প্রবাসীদের টার্গেট করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই সিন্ডিকেটের পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সরাসরি মদদ ছিল বলে জানা গেছে।
পার্লারের আড়ালে নিষিদ্ধ ব্যবসা ও ‘হানি ট্র্যাপ’

WhatsApp Image 2026 05 19 at 11.31.35 PM 1

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ফারহানা রুমি ধানমন্ডিতে ‘Zaaras Beauty Lounge & Fitness Centre’ এবং ‘Zaaras Attire’ পরিচালনা করে আসছেন।
তবে এটি কেবলই একটি পার্লার নয়, বরং এর অন্তরালে চলতো সরাসরি অনৈতিক কার্যক্রম।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ছত্র ছায়ায় ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের একঝাঁক রূপসী তরুণীকে ব্যবহার করে রাজধানীর ধনাঢ্য ব্যক্তি ও সরকারের উচ্চপদস্থ আমলাদের ফাঁদে ফেলা হতো। পরবর্তীতে তাদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে শুরু হতো ব্ল্যাকমেইল এবং কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি।

৫ই আগস্টের থাবা: গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই অনৈতিক সাম্রাজ্যে প্রথম আঘাত আসে।
গণরোষ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ভয়ে ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডের ‘কাজী টাওয়ার’ থেকে রুমির প্রতিষ্ঠানটিকে বের করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে রওশন আরা টাওয়ারে নতুন আস্তানা গেড়ে আবারও এই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

ভুয়া পদবী ও প্রতারণার জাল
ফারহানা রুমি নিজেকে ২০১৭ সাল থেকে ‘একুশে টেলিভিশন’ (ETV)-এর বিউটি কনসালটেন্ট হিসেবে দাবি করে বিভিন্ন পুরস্কার প্রদর্শন করলেও,
ইটিভি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, রুমি নামের কেউ সেখানে কখনোই কর্মরত ছিলেন না। এমনকি বিউটি কোর্সের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি।

একইভাবে ‘বিউটি সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ (BSOAB) এবং ‘বাংলাদেশ ওমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (BWCCI)-র মতো প্রথম সারির সংগঠনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পদ বা মেম্বারশিপ জাহির করলেও, প্রকৃতপক্ষে এসবের আড়ালে চলতো তার মধুফাঁদের নেটওয়ার্ক বিস্তার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানায়, এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানের নামে অফিস মাত্র একটি এবং তার মূল নিয়ন্ত্রক সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিপুলের ছোট ভাই অপু,
যার সাথে রুমির অবৈধ সম্পর্কের গুঞ্জন দীর্ঘদিনের।

ওমরাহ হজের নামে সৌদি আরবে মধুফাঁদ ও ‘তালাশ’র অনুসন্ধান

রুমি সিন্ডিকেটের অপরাধের পরিধি কেবল দেশেই সীমাবদ্ধ নয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে ‘ওমরাহ হজ’ পালনের নামে বিত্তশালীদের টার্গেট করে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হতো।
সেখানে নিজস্ব নারী সঙ্গীদের মাধ্যমে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্ল্যাকমেইলের জাল বিস্তার করা হতো।

ধামাচাপা পড়া তদন্ত ও ডিবির হারুন স্টাইল হয়রানি

বিগত সরকারের আমলে এই চক্রের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কল রেকর্ড, মেসেজের স্ক্রিনশট এবং ভিডিওসহ অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছিল। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে নামলেও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুলের সরাসরি হস্তক্ষেপে বারবার তদন্ত থমকে যায়।

WhatsApp Image 2026 05 19 at 11.31.36 PM

যে-ই এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, তাকেই কুরুচিপূর্ণ ও মানহানিকর সাইবার হামলার শিকার হতে হয়েছে।
প্রতিবাদকারীদের ভাগ্য নির্ধারণ হতো বিতর্কিত সাবেক ডিবি প্রধান হারুন আর রশীদের টর্চার সেলে।
যেভাবে পারটেক্স গ্রুপ বা আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেল এবং তার পরিবারকে হয়রানি করা হয়েছিল,
ঠিক একইভাবে এই রুমি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলা ভুক্তভোগীদের মুখ বন্ধ রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হতো।

পট পরিবর্তনে খোলস বদল: এখন টার্গেটে ছাত্রদল-যুবদল

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো,
গত ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও রুমি সিন্ডিকেটের অবসান ঘটেনি।
তারা কেবল তাদের ‘দাবার ঘুঁটি’ পরিবর্তন করেছে। তৎকালীন ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের সুন্দরীদের জায়গায় এখন স্থান করে নিয়েছে ছাত্রদল ও যুবদলের নামধারী কিছু সুন্দরী তরুণী।
নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে বিত্তশালী ও প্রবাসীদের জিম্মি করার মিশন এখনও সমানতালে চলছে।

কর্তৃপক্ষের প্রতি জরুরি আহ্বান।

এই ‘হানি ট্র্যাপ’ বা মধুফাঁদের কারণে রাজধানীর বুকে অসংখ্য সুখের সংসার ভেঙে যাচ্ছে,
বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে এবং লজ্জায়-মান সম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে পারছেন না।
সচেতন মহলের দাবি,
এই চক্রের কবল থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এবং তথাকথিত বিউটি পার্লার ও স্পা সেন্টারগুলোর আড়ালে চলা পতিতাবৃত্তি বন্ধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জনাব তারেক রহমান এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা উচিত। এই ‘দেশী এপিষ্ট্যান’ বা অন্ধকার ফাঁদ নির্মূল করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here