​ময়মনসিংহে ১৮ কোটির ‘উন্নয়ন বিলাস’: জনশূন্য মাঠে সড়ক-বাতি, নেপথ্যে প্রধান প্রকৌশলী!

0
206

ময়মনসিংহ: নগরীর অধিকাংশ ওয়ার্ডের বাসিন্দারা যখন ভাঙা রাস্তা আর সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় নাকাল, তখন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাশর এলাকায় চলছে এক আজব ‘উন্নয়ন বিযজ্ঞ’। প্রায় ৩০ একর খালি জমিতে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আরসিসি রাস্তা, ফুটপাত, ড্রেন ও আধুনিক লাইটিং করা হলেও এর সুবিধাভোগী মাত্র ৬টি পরিবার!

​অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী আমলা ও শিক্ষকদের নিজস্ব হাউজিং সোসাইটির প্লটের দাম বাড়াতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা এভাবে জলে ঢালা হয়েছে। আর এই নজিরবিহীন অপচয়ের মূল কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. রফিকুল ইসলাম মিঞার দিকে।
​খালি মাঠে কেন ১৮ কোটির প্রকল্প?

​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯৬ সালে রেলওয়ের প্রায় ৩০ একর জমি পানির দামে (শতাংশ প্রতি ৮-১২ হাজার টাকা) নিলামে কেনেন সরকারি আমলা ও শিক্ষকদের তিনটি সমবায় সমিতি অনন্যা হাউজিং, সমতট হাউজিং এবং নূরভাগ বহুমুখী সমবায় সমিতি।
পরিত্যক্ত এই এলাকাটিকে ‘ভিআইপি পাড়া’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তড়িঘড়ি করে ১৮ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। বর্তমানে সেখানে তেমন কোনো বসতি নেই, অথচ প্রতিটি খালি প্লটে যাতায়াতের জন্য ২-৩টি করে সংযোগ সড়ক তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ৮ হাজার টাকার জমির দাম রাতারাতি ২০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মূলত প্লট মালিকদের কোটিপতি বানাতেই এই বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

​এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিতর্কিত ভূমিকা পালন করছেন প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মিঞা। পদাধিকার বলে নগরের উন্নয়ন কাজের প্রশাসনিক ও তদারকির প্রধান দায়িত্ব তার। জনস্বার্থহীন এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিল পাস পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলেও এখন তিনি দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।

​এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। এক পর্যায়ে দাবি করেন, “প্রশাসক মহোদয়ের অনুমতি ছাড়া বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।” অথচ বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র এক মাস আগে, আর এই প্রকল্পের মূল কাজ হয়েছে তারও অনেক আগে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—তবে কি রফিক সাহেব তখন অনুমতি ছাড়াই ১৮ কোটি টাকা বিলিয়ে দিয়েছিলেন?
​
​নগরের এই বৈষম্যমূলক উন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় সামাজিক সংগঠক সোহেল রানা বলেন, “এটি উন্নয়ন নয়, বরং প্রভাবশালী আমলাদের জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন। রফিকুল ইসলাম মিঞার মতো কর্মকর্তারা দুর্নীতির জাল বুনেছেন বলেই আজ নগরবাসী সেবা বঞ্চিত। যেখানে মানুষ চলাচলের রাস্তা পায় না, সেখানে খালি মাঠে ৩টি করে রাস্তা করার অপরাধে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।”

​স্থানীয় পেশাজীবী ড. মোজাম্মেল হক বলেন, “শহরের প্রধান সড়কগুলো যেখানে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায়, সেখানে সেসব মেরামত না করে ফাঁকা মাঠে লাইটিং আর ফুটপাত বানানো দুর্নীতির স্পষ্ট দলিল।”

​৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুলতান উদ্দিন জানান, বছরের পর বছর ভাঙা রাস্তা মেরামতের আবেদন করেও “বাজেট নেই” বলে ফিরে আসতে হয়েছে তাদের। অথচ জনশূন্য এলাকায় ৩টি করে সংযোগ সড়ক দেওয়া স্পষ্টতই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি।
​
​ইতিমধ্যে সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ জনস্বার্থহীন এই প্রকল্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

​নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যান্য ওয়ার্ডেও নানা অসংগতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রশাসনিক চাপের মুখে তিনি এখন তড়িঘড়ি করে নথিপত্র গোছাতে শুরু করেছেন। নাগরিক সমাজের দাবি, রফিকুল ইসলাম মিঞার আমলের সকল প্রকল্পের শ্বেতপত্র প্রকাশ করে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here