ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় আড়াইশ বছরেরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী হুমগুটি খেলার ২৬৭তম আসর বসছে আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি, পৌষ মাসের শেষ দিনে। স্থানীয়ভাবে এই দিনটি পরিচিত ‘পুহুরা’ নামে। প্রতি বছরের মতো এবারও ফুলবাড়িয়ার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা এলাকায় তালুক ও পরগনার ঐতিহাসিক সীমানায় অনুষ্ঠিত হবে এই ব্যতিক্রমধর্মী লোকখেলা।
হুমগুটি খেলা মূলত একটি দলগত শক্তি ও সাহসের পরীক্ষা। খেলাটির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে প্রায় ২২ কেজি ওজনের পিতলের তৈরি গোলাকার একটি বল, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘হুমগুডি’। খেলা শুরু হলে মাঠজুড়ে হাজারো মানুষের ঢল নামে, আর চারপাশে প্রতিধ্বনিত হয়
“জিতই আবা দিয়া গুটি ধররে হেইও…”
স্থানীয়রা জানান, সাধারণত আমন ধান কাটা শেষ হওয়ার পর এবং বোরো আবাদ শুরুর আগের এই ফসলবিহীন সময়ে খোলা তৃণভূমিতে খেলাটি জমে ওঠে। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া কৃষাণ পরিবারের সুস্থ-সবল যুবক থেকে শুরু করে প্রাক-প্রবীণ বয়সীরাও এই খেলায় অংশ নেন।

হুমগুটি তৈরি করা হয় একটি বৃহদাকার পিতলের কলসির গলার নিচের গোলাকার অংশ দিয়ে। এর ভেতরে এমনভাবে মাটি ঠেসে ভরা হয় যে, মুখ বন্ধ করার পর হাতুড়ি দিয়ে পেটালেও ভেতরের মাটি বের করা যায় না। সেই ভারী গুটিই দুই পক্ষ নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য মাঠে নামেন।
স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় ২৫০ বছর আগে মুক্তাগাছার রাজা শশীকান্ত আচার্য্য ও ত্রিশালের বৈলরের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। তখন তালুক ও পরগনায় জমির মাপের ভিন্নতা ছিল তালুকে প্রতি কাঠা ছিল ১০ শতাংশ, আর পরগনায় সাড়ে ৬ শতাংশ।
এই বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা এলাকায় আয়োজন করা হয় এই হুমগুটি খেলা। শর্ত ছিল যে পক্ষ গুটি দখলে রাখতে পারবে, সেই এলাকা হবে ‘তালুক’, আর পরাজিত অংশ পরিচিত হবে ‘পরগনা’ নামে। সেই খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও ঐতিহ্য থেমে থাকেনি। স্থানীয় মোড়ল পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই খেলার আয়োজন করে আসছে।
প্রতিবছর বিকেল সোয়া ৪টায় খেলা শুরু হয় এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই জনসমাগমে ভরপুর ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, হুমগুটি খেলা ফুলবাড়িয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গ্রামীণ শক্তির প্রতীক।




